বাঙালির প্রিয় এক খাবার 'ভাত'!

বাঙালির প্রিয় এক খাবার 'ভাত' + পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম এক প্রোবায়োটিক পানীয় 'কেফির'!

আপনার অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য কেফির দিয়ে বাসি ভাত খাওয়া হতে পারে এক যুগান্তকারী ‘সিনবায়োটিক’ যুগলবন্দী!

বাঙালির প্রিয় এক খাবার 'ভাত'

বিজ্ঞানে একটি শব্দ আছে 'সিনবায়োটিক'। সহজ কথায়, যখন প্রোবায়োটিক (উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া) এবং প্রিবায়োটিক (ব্যাকটেরিয়ার প্রিয় খাবার) একসাথে শরীরে প্রবেশ করে, তখন তারা একে অপরের শক্তিকে শতগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়! অনেকেই প্রিবায়োটিকের জন্য ওটস, চিয়াসীড, ইসবগুল কিনতে গিয়ে হিমশিম খান! 


অথচ প্রতিদিনের ভাতকেই একটি বিশেষ উপায়ে প্রিবায়োটিক বানিয়ে ফেলা যায়! আর তা যদি কেফিরের সাথে মিশানো যায়, তবে শরীরের জন্য এমন এক অনন্য উপকারী খাবার হবে—যা আগে কখনো ভাবা যায়নি! 


প্রথমে তিনটি সহজ শব্দ চিনে নিতে হবে— প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক এবং সিনবায়োটিক। 


কেফির হলো একটি প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক, যার মধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও উপকারী ইস্ট জীবন্ত অবস্থায় থাকে। এরা আমাদের অন্ত্র বা পেটের ভেতরের পরিবেশ রক্ষা করে। 


আর প্রিবায়োটিক হলো এক ধরণের বিশেষ ফাইবার বা শর্করা, যা আমাদের পরিপাকতন্ত্র হজম করতে পারে না, কিন্তু এটি আমাদের পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোর প্রধান খাদ্য। 


যখন আমরা কেফিরের মতো প্রোবায়োটিকের সাথে প্রিবায়োটিক মেলাই, তখন তৈরি হয় ‘সিনবায়োটিক’ যুগলবন্দী! তখন কেফিরের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো তাদের প্রিয় খাবার পেয়ে যায়। ফলে তারা খুব শক্তিশালী হয়ে আমাদের বৃহদান্ত্রে বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং হজম প্রক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সার্বিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করতে অবদান রাখে!


কেফিরের সাথে ভাত খাওয়াটা কেন এত স্বাস্থ্যকর, 

এর স্বাদ কেমন হবে 

এবং এটি সবার জন্য আদৌ নিরাপদ কি না? 


প্রথমত, এই কম্বিনেশনটি আমাদের অন্ত্রের দেয়ালকে পুনর্গঠন করতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক ও আইবিএস এর মতো জটিল সমস্যা দূর করতে খুব কার্যকরী হতে পারে। 

ভাতের নিজস্ব মৃদু মিষ্টি ভাব রয়েছে, যা কেফিরের টক ভাবটাকে হালকা করে দেয়। এটি খাওয়ার সময় চমৎকার ক্রিমি, পান্তা ভাতের মতো এক স্বাদ পাওয়া যায়, যা গরমের দিনে শরীরকে ভেতর থেকে শীতল ও সতেজ রাখে। 

এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, কারণ আমরা কেফিরের ও ভাতের প্রাকৃতিক গুণাগুণকেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাড়িয়ে নিচ্ছি!


তবে মনে রাখবেন, সাধারণ গরম ভাত কিন্তু প্রিবায়োটিক নয়। গরম ভাতে কোনোভাবেই কেফির মেশানো যাবে না, কারণ গরমের সংস্পর্শে এলে কেফিরের জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া মারা যাবে!


কেফিরের সাথে খাওয়ার জন্য ভাতটিকে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় রেডি করে নিতে হবে, যাতে এতে প্রচুর পরিমাণে ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ তৈরি হয়!


ভাতকে এই শক্তিশালী প্রিবায়োটিকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি খুব সহজ। প্রতিদিন ঘরে যে ভাত রান্না হয়, সেখান থেকে আপনার প্রয়োজনমতো ভাত একটি আলাদা পাত্রে তুলে নিন। এবার ভাতটিকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঠান্ডা হতে দিন। ভাত পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে গেলে পাত্রটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে সরাসরি ফ্রিজের নরমাল চেম্বারে রেখে দিন অন্তত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য। 

ভাত যখন দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রিজের ঠান্ডায় (প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়) থাকে, তখন এর সাধারণ স্টার্চ গঠন পরিবর্তন করে 'রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ'-এ রূপান্তরিত হয়! এই রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রে দ্রুত হজম হয়ে রক্তে হঠাৎ সুগার বাড়ায় না! বরং সরাসরি বৃহদান্ত্রে গিয়ে উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের জন্য ভূড়িভোজের আয়োজন করে! আর ব্যাকটেরিয়ারা খেয়েদেয়ে আপনার স্বাস্থ্য ভালো করার কাজে লেগে পড়ে!


এই দুর্দান্ত খাবারটি কখন, কীভাবে এবং কতটুকু খাবেন তাও কিন্তু জানা থাকা জরুরি। 

এটি খাওয়ার সবচেয়ে উত্তম সময় হলো সকালের নাস্তা হিসেবে অথবা দুপুরে ভারী খাবারের মাঝামাঝি সময়ে। 

ফ্রিজ থেকে ভাত বের করার পর তা কিছুটা শক্ত ও অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকে, যা সরাসরি কেফিরে দিলে খেতে ভালো লাগবে না এবং পেটে অস্বস্তি হতে পারে। তাই ফ্রিজ থেকে ভাত বের করে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় অন্তত আধঘণ্টা রেখে দিন, যাতে ভাতের অতিরিক্ত ঠান্ডা ভাব কেটে যায়। 

(খবরদার! ভাত গরম করার জন্য ওভেনে বা প্যানে দেওয়া যাবে না, রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ নষ্ট হয়ে যাবে!)


প্রতি বেলার জন্য এক কাপ (প্রায় ১০০-১৫০ গ্রাম) এই স্পেশাল বাসি ভাতের সাথে হাফ কাপ থেকে এক কাপ (১০০-২০০ মিলি) মিল্ক কেফির মিশিয়ে খেয়ে নিন। 

মন চাইলে এর সাথে সামান্য কাঁচা মরিচ কুচি, একটু পেঁয়াজ কুচি দিয়ে মেখে নিতে পারেন। 

আপনি যদি ঝাল বা পেঁয়াজ খেতে না চান, পেঁয়াজের বদলে পুদিনা পাতা বা ধনেপাতা কুচি ব্যবহার করতে পারেন। কুচি করা শসা দিলে এটি আরও বেশি রিফ্রেশিং হবে। খুব সামান্য আদা কুচিও দিতে পারেন। 

এক চিমটি পিঙ্ক সল্ট ও সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো দিতে পারেন, যা টক ভাবকে ব্যালেন্স করবে।


যারা টক স্বাদ পছন্দ করেন না বা ডেজার্ট হিসেবে খেতে চান, তারা মিষ্টি ভার্সন তৈরি করতে পারেন। ভাতের সাথে কেফির মিশিয়ে তাতে সামান্য মধু বা গুড় যোগ করতে পারেন। খুব বেশি পরিমাণে গুড় দেবেন না, ১ চা চামচই যথেষ্ট। মধুর ক্ষেত্রে আপনি 'র' বা কাঁচা মধু ব্যবহার করবেন। 

স্বাদ এবং পুষ্টি বাড়াতে এতে পাকা কলা, আম, আপেল মেশাতে পারেন। কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, কিশমিশ, তিল, তিসি ইত্যাদি যোগ করলে এটি আরো পুষ্টিকর হবে। চাইলে সামান্য দারুচিনির গুঁড়ো যোগ করতে পারেন। 


ঝাল, মিষ্টি বা নোনতা যেভাবেই খান না কেন, একটি বিষয় মাথায় রাখবেন - এটা গরম করবেন না বা গরম কিছু মেশাবেন না।

মূল উদ্দেশ্য হলো আপনি যেন প্রতিদিন এই স্বাস্থ্যকর খাবারটি আনন্দের সাথে খেতে পারেন। 

এটি আপনি সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন অনায়াসে খেতে পারেন। শরীর যদি সুন্দরভাবে গ্রহণ করে, তবে এটি টানা কয়েক মাস ধরে প্রতিদিনের নিয়মিত খাদ্যতালিকাতেও রাখা যায়!


তবে এই স্বাস্থ্যকর জার্নিতে কিছু বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, কারণ সামান্য অসাবধানতায় উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হতে পারে। 


গরমের দিনে রান্না করা ভাত যদি ফ্রিজে না রেখে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ বাসি করা হয়, তবে তাতে 'ব্যাসিলাস সেরিয়াস' নামক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়, যা ফুড পয়জনিং ঘটাতে পারে। তাই ভাত ঠান্ডা হওয়ামাত্রই ফ্রিজে ঢোকাতে হবে। 


তারপর, কেফির নিজে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রোবায়োটিক এবং এই স্পেশাল বাসি ভাতেও ফারমেন্টেশনের গুণ থাকে, তাই এই দুটি একসাথে শরীরে গেলে শুরুতে পেটে সামান্য গ্যাস, পেট ফাঁপা বা মৃদু অস্বস্তি হতে পারে। একে বিজ্ঞানের ভাষায়, শরীরের ভেতরের 'ডাই-অফ ইফেক্ট' কিংবা এক ধরণের 'অ্যাডজাস্টমেন্ট' বলা যায়। এতে ভয়ের কিছু নেই। 


তাই প্রথম সপ্তাহে চার-পাঁচ চামচ ভাত এবং সামান্য কেফির দিয়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে শরীরের সহনশীলতা বুঝে পরিমাণ বাড়ান। 

নিজের শরীরের সংকেতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবেন এবং সবক্ষেত্রেই নিজের কান্ডজ্ঞান কাজে লাগাবেন।


ফ্রিজের বাসি ভাত সর্বোচ্চ ২ দিনের বেশি পুরনো করবেন না এবং ফ্রিজ থেকে বের করা ভাত ঘরের তাপমাত্রায় আনার পর দ্রুত খেয়ে ফেলবেন, দীর্ঘক্ষণ বাইরে ফেলে রাখবেন না। 

এই নিয়মগুলো মেনে চললে এবং নিয়মিত খেলে কেফির ও ভাতের এই সিনবায়োটিক যুগলবন্দী হয়ে উঠবে আপনার স্বাস্থ্যের জন্য এক পরম আশীর্বাদ!

Post a Comment

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম