সমুদ্র বা নদীর তলদেশে পড়ে থাকা ঝিনুককে দেখলে আপনার মনে হতে পারে, ওটা নিছকই একটা প্রাণী। অলস হয়ে চুপচাপ মাটির নিচে কিংবা পাথরের গায়ে আটকে পড়ে থাকা ছাড়া এর তেমন কোনো কাজ নেই। কিন্তু আপনি কি জানেন? আপনি যখন এই পোস্টটি পড়ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ঝিনুক ও শামুক নিঃশব্দে আমাদের এই আস্ত পৃথিবীকে এক বিশাল পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে চলেছে!
বিজ্ঞানীরা এদেরকে বলেন প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত ‘বায়োলজিক্যাল ওয়াটার ফিল্টার’ (Biological Water Filter)।
মানুষ আজ নদী-নালা আর সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলে এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে, যা পুরো জলজ জগতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্লাস্টিক যখন ভেঙে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক কণায় পরিণত হয়, তাকে বলে মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastics)। এই অদৃশ্য বিষ এতই সূক্ষ্ম যে, মানুষের বানানো আধুনিক ওয়াটার ফিল্টারগুলোও সব সময় এগুলোকে আটকে রাখতে পারে না।
কিন্তু এই কঠিন কাজটিই খুব সহজে করে ফেলছে—সাধারণ শামুক ও ঝিনুক!
একটি ঝিনুক বা 'মাসেল' (Mussel) প্রতিদিন লিটার লিটার পানি নিজের ফুলকা বা গিল (Gill)-এর ভেতরে টেনে নেয়। সেই পানির সাথে থাকা আণুবীক্ষণিক খাবার ছেঁকে নেওয়ার সময় সে পানি থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ময়লা—এমনকি ঘণ্টা প্রতি হাজার হাজার আণুবীক্ষণিক মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাও ছেঁকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে!
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয়টি হলো, এই ক্ষতিকর প্লাস্টিক ও বিষাক্ত কণাগুলো ঝিনুকের শরীরের ভেতরের পুষ্টি প্রক্রিয়ায় কোনো ক্ষতি তৈরি করে না। সে এগুলোকে একটি বিশেষ জৈব তরল বা শ্লেষ্মা (Mucus) দিয়ে পেঁচিয়ে ভারী গোলকের মতো তৈরি করে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ছদ্ম-মল’ (Pseudofaeces)। এই ভারী কণাগুলো পানির ওপরে ভেসে না থেকে সোজা তলদেশে তলানি হিসেবে জমা হয়ে পড়ে। ফলে উপরিভাগের পানি হয়ে ওঠে পরিষ্কার, নির্মল ও স্বচ্ছ!
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক একর জায়গার একটি ঝিনুকের চড় (Oyster reef) প্রতিদিন কোটি কোটি গ্যালন পানি পরিশোধন করতে পারে। তাদের এই জাদুকরী মেকানিজম নকল করে বিজ্ঞানীরা এখন বড় বড় শহরের ড্রেনেজ ও বর্জ্য পানি শোধনাগার বা ‘বর্জ্য শোধন প্রযুক্তি’ (Waste Water Treatment Plant) বানানোর চেষ্টা করছেন!
একটু শান্ত হয়ে ভাবুন, আর নিজের মনকে প্রশ্ন করুন—
চোখ, কান ও হাতবিহীন, একটা খোলসের ভেতরে আটকে থাকা এই ক্ষুদ্র ঝিনুকটিকে কে শেখাল কীভাবে পানি থেকে বিষাক্ত প্লাস্টিক ছেঁকে আলাদা করতে হয়? কে তাকে এই অলৌকিক ডাবল-ফিল্টারিং মেকানিজম দান করল?
নিশ্চয়ই তিনি—যিনি এই বিশাল মহাবিশ্বের অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে মহাসমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত সবকিছুর নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেছেন! যিনি আমাদের অজান্তেই প্রকৃতির বুকে কোটি কোটি নিঃশব্দ ‘ওয়াটার ফিল্টার’ বসিয়ে রেখে পুরো পৃথিবীর জলজ ভারসাম্য রক্ষা করছেন।
আমরা সামান্য প্রযুক্তি বানিয়ে অহংকারে মাটি স্পর্শ করতে চাই না; অথচ রবের তৈরি একটি অণুবীক্ষণিক ঝিনুক প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদেরই ফেলা ময়লা পরিষ্কার করে চলেছে। সৃষ্টির এই নীরব শিক্ষক কি আমাদের আবার নতুন করে রবের সামনে বিনীত হওয়ার ইশারা দেয় না?
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রবের পরম অনুগ্রহ অনুভব করতে—এই রঙিন দুনিয়া আর শয়তানের ইশারা থেকে বের হয়ে যাত্রা করুন সেই রবের দিকে, যিনি আপনাকে প্রতিটি মুহূর্তে পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছেন এবং যিনি বিচার দিবসের একমাত্র মালিক।
