দাম্পত্য জীবনে বিশ্বাস, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক পরিবারেই একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে—স্বামীর পকেট থেকে বা মানিব্যাগ থেকে তাঁর অনুমতি ছাড়া টাকা নেওয়া কি ইসলামে জায়েজ? কেউ বলেন, স্ত্রী চাইলে নিতে পারেন। আবার কেউ বলেন, এটি চুরি। তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক অবস্থান কী?
এই আর্টিকেলে আমরা কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ইসলামী ফিকহের আলোকে বিষয়টি সহজভাবে জানার চেষ্টা করব।
ইসলামে অন্যের সম্পদের মর্যাদা
ইসলাম মানুষের সম্পদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
> "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।"
— (সূরা আন-নিসা: ২৯)
এই নির্দেশনা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিয়ের সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, একজনের সম্পদের ওপর আরেকজনের সীমাহীন অধিকার নেই।
তাহলে স্ত্রী কি স্বামীর অনুমতি ছাড়া টাকা নিতে পারবেন?
এর উত্তর এক কথায় "হ্যাঁ" বা "না" নয়। বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
১. যদি স্বামী সংসারের খরচ ঠিকমতো দেন
যদি স্বামী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং প্রয়োজনীয় খরচ দেন, তাহলে তাঁর অজান্তে বা অনুমতি ছাড়া টাকা নেওয়া বৈধ নয়।
এ ধরনের কাজ দাম্পত্য সম্পর্কে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। ইসলামে পারস্পরিক আমানত রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২. যদি স্বামী ন্যায্য খরচ না দেন
যদি স্বামী সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী ও সন্তানের প্রয়োজনীয় ভরণপোষণ না দেন, তাহলে ভিন্ন বিধান রয়েছে।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, হিন্দ বিনতে উতবা (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করেন যে তাঁর স্বামী আবু সুফিয়ান যথেষ্ট খরচ দেন না।
তখন নবী ﷺ বলেন:
> "তুমি তোমার এবং তোমার সন্তানের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যতটুকু যথেষ্ট, ততটুকু নিতে পারো।"
— সহিহ বুখারি
এই হাদিস থেকে আলেমরা বলেন, যদি স্বামী ফরজ ভরণপোষণ না দেন, তাহলে স্ত্রী প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায্য পরিমাণ নিতে পারবেন। তবে অপচয় বা অতিরিক্ত নেওয়া বৈধ নয়।
গোপনে টাকা নেওয়া কি চুরি?
সব ক্ষেত্রে নয়।
যদি স্বামী সংসারের অধিকার আদায় না করেন এবং স্ত্রী বাধ্য হয়ে নিজের ও সন্তানের ন্যায্য প্রয়োজন পূরণের জন্য সীমিত পরিমাণ নেন, তাহলে এটি সাধারণ অর্থে চুরি হিসেবে গণ্য হবে না।
কিন্তু ব্যক্তিগত শখ, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বা গোপনে টাকা জমানোর উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়া টাকা নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
স্বামীর দায়িত্ব কী?
ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর।
এর মধ্যে রয়েছে—
- খাদ্য
- পোশাক
- বাসস্থান
- চিকিৎসা
- প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন ব্যয়
যদি তিনি এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন, তাহলে স্ত্রীও তাঁর সম্পদের ব্যাপারে সততা বজায় রাখবেন।
স্ত্রীর করণীয় কী?
একজন আদর্শ মুসলিম স্ত্রীর উচিত—
- স্বামীর সম্পদকে আমানত হিসেবে দেখা।
- প্রয়োজন হলে খোলামেলা আলোচনা করা।
- অনুমতি নিয়ে টাকা ব্যবহার করা।
- সংসারে বিশ্বাস ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে বিরত থাকা।
দাম্পত্য জীবনে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় সম্পদ
অনেক সময় টাকার পরিমাণ খুব কম হলেও, অনুমতি ছাড়া নেওয়ার কারণে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। আবার অনেক স্বামী এমনও আছেন যারা নিজের আয়-ব্যয়ের বিষয় স্ত্রীকে জানাতে চান না। উভয় পক্ষেরই উচিত খোলামেলা আলোচনা করা এবং পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখা।
ইসলাম শুধু হালাল-হারামের বিধানই দেয় না; বরং সুন্দর পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলারও শিক্ষা দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এই মাসআলার প্রয়োগে ব্যক্তিভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। যদি কোনো পরিবারে ভরণপোষণ, সম্পত্তি বা আর্থিক অধিকার নিয়ে জটিলতা থাকে, তাহলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির সঙ্গে পরামর্শ করা উত্তম।
স্বামীর অনুমতি ছাড়া তাঁর পকেট থেকে টাকা নেওয়া সাধারণভাবে জায়েজ নয়, যদি তিনি স্ত্রী ও পরিবারের ন্যায্য ভরণপোষণ যথাযথভাবে প্রদান করেন। তবে স্বামী যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফরজ ভরণপোষণ না দেন, তাহলে সহিহ হাদিসের আলোকে স্ত্রী নিজের ও সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিতে পারেন। এর বাইরে অতিরিক্ত বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে গোপনে টাকা নেওয়া ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো—দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, সততা, আমানতদারি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে তোলা।
