সত্য জানার পর মেয়ের চোখে ঘৃণা।
মহল্লার এক লোক মারা গেল। সবাই দেখতে যাচ্ছে। এলাকার মুরব্বি ব্যক্তি হিসেবে শায়েখ আব্দুল্লাহও দেখতে গেলেন। মৃত লোকটা পরিচিতই ছিল।
অনেক মানুষই এসেছে। মহিলারা কাঁদছে। আত্মীয়েরা স্বান্তনা দিচ্ছে। কিন্তু লোকটার মেয়ের কান্না চোখে লাগার মতো। একটু অন্য রকম। মেয়েরা চিৎকার করে কান্নাকাটি করে, দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে, আবেগে আবল-তাবল বকেও কেউ কেউ—এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই ব্যক্তির মেয়ে কেমন পাগলের মতো কাঁদছে।
শায়েখ আব্দুল্লাহ মেয়েটির কাছে গিয়ে বললেন, ‘দেখো মা, পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না। আমরাও একদিন মারা যাব। তোমার বাবা মরে গেছেন, এটাই কদর। এতে না-রাজি প্রকাশ কোরো না। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন।’
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘শায়েখ, আমার বাবা মারা গেছেন—এটা আমি মেনে নিয়েছি। আল্লাহর কদরে আমার কোনো অসন্তুষ্টি নেই। কিন্তু আমি কাঁদছি...’ একটু থেমে মেয়েটি বলল, ‘আমার বাবা যেভাবে মারা গেলেন, সেটা মনে করে আমি কাঁদছি।’
শায়েখ অবাক হলেন। ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলেন সেখান থেকে। লোকটি কীভাবে মারা গেলেন, জিজ্ঞেস করলেন না। কেননা আশেপাশে অনেক মহিলা। মেয়েটি যদি বিব্রত বোধ করে। সে যদি না চায় অন্য মানুষেরা জানুক।
পরে মেয়েটি শায়েখকে জানাল—‘আমার বাবা প্রতিদিন অফিস থেকে এসে নিজের ঘরে ঢুকতেন। এরপর দরজা লক করে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো ঘুমাতেন। দুই ঘণ্টা পর বের হয়ে খাবার খেতেন, আমাদের সাথে গল্প করতেন বা বাসার অন্য কোনো কাজ করতেন। এটাই ছিল তার নিয়ম। প্রতিদিনের মতো আজও বাবা অফিস থেকে এসে নিজের রুমে চলে যান। দুই ঘণ্টা পার হলো, তিন ঘণ্টা হলো। খাওয়ার জন্য বাবাকে ডাকা হলো—কোনো সাড়া নেই। এভাবে চার-পাঁচ ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে, আমরা দরজায় নক করছি, তারপরও কোনো উত্তর নেই। ছয় ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরও যখন সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আমরা দরজা ভাঙতে বাধ্য হই। ভেতরে ঢুকে দেখি, বাবা বিছানায় শুয়ে অচেতন, আর তার ল্যাপটপে ভিডিও চলছে। কিন্তু ভিডিওগুলো...’ গলা জড়িয়ে এলো মেয়েটির।
‘ল্যাপটপে খুবই নোংরা-অশ্লীল ভিডিও চলছিল। আমরা কখনো ভাবতে পারিনি বাবা এসব ভিডিও দেখেন, তাও এই বয়সে!’
শায়েখ নিচে-মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দেখলেন মেয়েটির ফোটা ফোটা অশ্রু পড়ছে মেঝেতে।
‘বাবা প্রতিদিন এসে দুই-আড়াই ঘণ্টা ওই রুমে কাটাতেন। আমরা ভাবতাম অফিস থেকে ফিরেছেন—ক্লান্ত—ঘুমাচ্ছেন। কোনো ডাকাডাকি করতাম না, কোনো ডিস্টার্ব করতাম না এই দুই ঘণ্টা। কিন্তু... কিন্তু তিনি যে সবার আড়ালে নোংরা ভিডিও দেখতেন, আর এই অবস্থাতেই উনার মৃত্যু হলো—এটা ভাবতেই ঘেন্না লাগে, গা গুলিয়ে আসে।' এরপর আর কথা বলতে পারল না মেয়েটি। ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
আসলে কেউ যখন প্রথমবার গোপনে কোনো গুনাহ করে, তার খারাপ লাগে, সে তাওবাহ করে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। কিন্তু কিছু মানুষ অন্যদের লুকিয়ে গুনাহ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাদের আর গুনাহ করতে খারাপ লাগে না। তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। এক সময় তাদের এই গোপন গুনাহ আর গোপন থাকে না, আল্লাহ অন্যদের সামনে তা প্রকাশ করে দেন। আর কেউ যদি গুনাহ করা অবস্থায় মারা যায়—ব্যাপারটা কতই না খারাপ! কারণ হাদিসে এসেছে—“প্রত্যেক বান্দাকে সেই অবস্থায় উঠানো হবে, যে অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৭৮]
[সত্য ঘটনা অবলম্বনে]
